বৈদিক সভ্যতা ( Vedic Age )
উৎস ও বিস্তার: আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে এসে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। তুরস্কের 'বোগাজকোই শিলালিপি' (Boghazkoi Inscription) থেকে আর্যদের কথা জানা যায়।
ভাষা ও সমাজ: এদের প্রধান ভাষা ছিল সংস্কৃত। বৈদিক সভ্যতা ছিল মূলত গ্রামীণ ও পুরুষতান্ত্রিক। আর্য শব্দের অর্থ 'জাতি' বা 'সদ্বংশজাত'।
সময়কাল (1500 - 600 BC): এই সভ্যতাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
1. আদি বৈদিক যুগ (Early Vedic Age: 1500 - 1000 BC)
2. পরবর্তী বৈদিক যুগ (Later Vedic Age: 1000 - 600 BC)
1. বেদ ও বৈদিক সাহিত্য
বৈদিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো বেদ (যার অর্থ 'জ্ঞান')। বেদের অপর নাম শ্রুতি (শুনে শুনে মনে রাখা হতো) এবং অপৌরুষেয় (ঈশ্বরের সৃষ্ট)। বেদ মোট 4 প্রকার এবং প্রতিটি বেদের 4 টি অংশ রয়েছে (সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ)।
| বেদের নাম | উপবেদ | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| ঋক বেদ (Rig Veda) | আয়ুর্বেদ | পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ। এতে 10 টি মণ্ডল এবং 1028 টি শ্লোক আছে। 3য় মণ্ডলে গায়ত্রী মন্ত্র (বিশ্বামিত্র রচিত) এবং 10ম মণ্ডলে পুরুষ সূক্তের (4 টি বর্ণের উৎপত্তির কথা) উল্লেখ আছে। |
| সাম বেদ (Sama Veda) | গান্ধর্ববেদ | ভারতীয় সংগীতের উৎস। এটি সুর করে গাওয়া হতো (গায়কদের 'উদ্গাতা' বলা হতো)। |
| যজুর বেদ (Yajur Veda) | ধনুর্বেদ | ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও যাগযজ্ঞের নিয়মকানুন লেখা আছে। এটি শুক্ল ও কৃষ্ণ এই দুটি ভাগে বিভক্ত। |
| অথর্ব বেদ (Atharva Veda) | স্থাপত্যবেদ | তান্ত্রিক ক্রিয়া, কালাজাদু এবং ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের উৎস। এটি 20 টি খণ্ডে বিভক্ত। |
2. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও দর্শন
- উপনিষদ: এদের 'বেদান্ত' বলা হয়। মোট উপনিষদ 108 টি। প্রাচীনতম হলো বৃহদারণ্যক। ভারতের জাতীয় নীতিবাক্য 'সত্যমেব জয়তে' মুণ্ডক উপনিষদ থেকে নেওয়া হয়েছে।
- বেদাঙ্গ: বেদ পাঠের সহায়ক অঙ্গ মোট 6 টি (শিক্ষা, ছন্দ, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ, কল্প)। পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী' প্রাচীনতম ব্যাকরণ বই।
- পুরাণ ও স্মৃতি: মোট পুরাণ 18 টি (প্রাচীনতম: মৎস্য পুরাণ)। স্মৃতি 4 টি (প্রাচীনতম: মনুস্মৃতি)।
- মহাকাব্য:
- রামায়ণ: বাল্মীকির লেখা প্রাচীনতম বা আদি কাব্য (7 টি কাণ্ড)। বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন কৃত্তিবাস ওঝা।
- মহাভারত: বেদব্যাসের লেখা দীর্ঘতম মহাকাব্য (18 টি পর্ব, দীর্ঘতম শান্তি পর্ব)। ভগবদগীতা ভীষ্ম পর্বের অংশ। বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন কাশীরাম দাস।
| ষড় দর্শন (6 Schools of Philosophy) | প্রবর্তক |
|---|---|
| ন্যায় দর্শন (Nyaya) | গৌতম |
| বৈশেষিক দর্শন (Vaisheshika) | কণাদ |
| সাংখ্য দর্শন (Samkhya - প্রাচীনতম) | কপিল |
| যোগ দর্শন (Yoga) | পতঞ্জলি |
| পূর্ব মীমাংসা (Purva Mimansa) | জৈমিনি |
| উত্তর মীমাংসা (Uttar Mimansa) | বাদরায়ণ (ব্যাস) |
3. সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি
- দেবতা: আদি বৈদিক যুগে ইন্দ্র (পুরন্দর বা দুর্গ ধ্বংসকারী), অগ্নি ও বরুণ প্রধান দেবতা ছিলেন। তবে পরবর্তী যুগে প্রজাপতি (সৃষ্টিকর্তা) ও রুদ্র বেশি প্রাধান্য পান। ঋকবেদে প্রকৃতির উপাসনা হতো, মূর্তি পূজা ছিল না।
- অর্থনীতি: আদি যুগে পশুপালন প্রধান জীবিকা ছিল। গোরুকে 'অঘ্ন্যা' (অবধ্য) এবং সম্পদের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হতো। পরবর্তী যুগে লোহার ব্যবহার (কৃষ্ণ অয়স) শুরু হলে কৃষিকাজ প্রধান জীবিকায় পরিণত হয়।
- রাজনৈতিক পরিষদ: 'সভা' (বয়স্কদের পরিষদ) এবং 'সমিতি' (সাধারণ মানুষের পরিষদ) প্রধান ছিল। রাজা 'রাজসূয়', 'অশ্বমেধ' ও 'বাজপেয়' যজ্ঞ করতেন।
- বর্ণাশ্রম প্রথা: মানুষের জীবন 4 টি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল— ব্রহ্মচর্য (0-25), গার্হস্থ্য (25-50), বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস।
- বিবাহ: সমাজে অনুলোম (উঁচু বর্ণের পাত্র, নিচু বর্ণের পাত্রী) ও প্রতিলোম (উঁচু বর্ণের পাত্রী, নিচু বর্ণের পাত্র) বিবাহ প্রচলিত ছিল। এছাড়া ব্রাহ্ম, গান্ধর্ব, আসুর, রাক্ষস ইত্যাদি 8 প্রকার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে।
4. আদি ও পরবর্তী বৈদিক যুগের মূল পার্থক্য
| আদি বৈদিক যুগ (Early Vedic Period) | পরবর্তী বৈদিক যুগ (Later Vedic Period) |
|---|---|
| মানুষ মূলত পশুপালক ছিল। | মানুষ মূলত কৃষিজীবী হয়ে ওঠে (লোহার আবিষ্কার)। |
| নারীদের সামাজিক অবস্থান ভালো ছিল, বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল। | নারীদের সামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটে। |
| বর্ণপ্রথা পেশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল (বংশানুক্রমিক ছিল না)। | বর্ণপ্রথা সম্পূর্ণ জন্মভিত্তিক বা বংশানুক্রমিক ও কঠোর হয়। |
| মূর্তি পূজার চল ছিল না। | মূর্তি পূজা শুরু হয় এবং যজ্ঞের প্রভাব বাড়ে। |
| কেবলমাত্র ঋক বেদ রচিত হয়েছিল। | সাম, যজুর ও অথর্ব বেদ রচিত হয়। |
5. নদীগুলির প্রাচীন ও বর্তমান নাম (Rivers in Vedic Age)
ঋকবেদে হিমবন্ত (হিমালয়) এবং মুঞ্জাবত (হিন্দুকুশ) পর্বতের উল্লেখ আছে। ঋকবেদে গঙ্গা নদীর নাম 1 বার, যমুনা 3 বার এবং সরস্বতীর নাম 50 বারের বেশি উল্লিখিত হয়েছে।
| বর্তমান নাম (Present Name) | প্রাচীন নাম (Old Name) |
|---|---|
| সিন্ধু (Indus) | সিন্ধু (Sindhu) |
| ঝিলম (Jhelum) | বিতস্তা (Vitasta) |
| চেনাব (Chenab) | আসকিনি (Askini) |
| রাভি (Ravi) | পুরুষিনী (Purushini) |
| বিয়াস (Beas) | বিপাশা (Bipasha) |
| সুতলেজ (Sutlej) | শতদ্রু (Shutudri) |
| সরস্বতী (Saraswati) | পৌরাণিক নদী (Mythical River) |
6. দশ রাজার যুদ্ধ (Battle of 10 Kings)
- উল্লেখ: ঋকবেদের 7-তম মণ্ডলে এই দশরাজ্ঞ যুদ্ধের (Dasarajna Yuddha) উল্লেখ রয়েছে।
- স্থান: যুদ্ধটি পুরুষিনী (রাভি) নদীর তীরে সংঘটিত হয়েছিল।
- ফলাফল: ভরত উপজাতি (নেতা সুদাস) এবং 10 জন রাজার মধ্যে এই যুদ্ধ হয়, যেখানে ভরত উপজাতি জয়লাভ করে। যুদ্ধে 'ইশুকৃত' (Ishukrit) নামক তীরের ব্যবহার হতো।
7. বেদ ও উপনিষদের গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি
| বেদের নাম | যাঁরা পাঠ করতেন (Reciters) | অন্যান্য তথ্য |
|---|---|---|
| ঋক বেদ | হোতা (Hotri) | 2-য় থেকে 7-ম মণ্ডল আগে রচিত। 9-ম মণ্ডলে সোম দেবতা এবং 'সোমরস' (Energy Drink)-এর উল্লেখ আছে। |
| সাম বেদ | উদ্গাতা (Udgatris) | ছান্দোগ্য এবং কেন উপনিষদ এর অংশ। |
| যজুর বেদ | অধ্যর্যু (Adhvaryu) | কঠ উপনিষদে নচিকেতা ও যমের (মৃত্যুর দেবতা) গল্প রয়েছে। |
| অথর্ব বেদ | ব্রাহ্মণ (Brahmanas) | মহা উপনিষদের 6-ষ্ঠ অধ্যায় থেকে 'বসুধৈব কুটুম্বকম' (সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার) কথাটি নেওয়া হয়েছে। |
8. সমাজ, প্রশাসন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শব্দ
- গবিষ্ঠি (Gavishti): গোরুর জন্য যুদ্ধ। গোরুকে পবিত্র (অঘ্ন্যা) মানা হতো এবং ধনসম্পদের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হতো (ধনী ব্যক্তিকে গোমত বলা হতো)।
- বাল্যবিবাহ ও বিধবা বিবাহ: আদি বৈদিক যুগে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল না। তবে 'নিয়োগ' (Niyoga) বা বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল।
- প্রশাসনিক স্তর: সমাজের স্তরগুলি ছিল ক্রমান্বয়ে— কুল (Kula) -> গ্রাম (Grama) -> বিশ (Visa) -> জন (Jana) -> রাষ্ট্র (Rashtra)। 'সভা' ও 'সমিতি' ছাড়াও বিদথ (Vidhata) নামে একটি ধর্মীয় পরিষদ ছিল (যা পরবর্তী যুগে বিলুপ্ত হয়)।
- কৃষিজ ফসল: বৈদিক যুগে ফসলের আলাদা নাম ছিল। যেমন- ব্রীহি (Vrihi) মানে চাল, গোধূম (Godhuma) মানে গম এবং যব (Yava) মানে বার্লি। ধান্য বলতে সমস্ত রকম শস্যকে বোঝানো হতো।
- মাটির পাত্র (Pottery): আদি বৈদিক যুগে গেরুয়া রঙের (Ochre) পাত্র ব্যবহৃত হলেও, পরবর্তী বৈদিক যুগে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র বা Painted Grey Ware (PGW) বেশি ব্যবহৃত হতো।
- তিলকের মতবাদ: বাল গঙ্গাধর তিলক তাঁর 'The Arctic Home in the Vedas' বইতে বলেছেন যে আর্যরা সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চল থেকে এসেছিল।

Social Plugin