সিন্ধু সভ্যতা
(Indus Valley Civilization)
বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই পোস্টে ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilization) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে। এখানে সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল, আবিষ্কার, ভৌগোলিক বিস্তৃতি, নগর পরিকল্পনা, কৃষি ও পশুপালন, বাণিজ্য ও কারুশিল্প, লিপি, ধর্মীয় বিশ্বাস, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য এবং প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রগুলোর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই তথ্যগুলি SSC GD, SSC MTS, WBP Constable, RRB Group D, PSCWB সহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার জেনারেল নলেজ ও ইতিহাস প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।
সময়কাল: 2500 - 1750 খ্রিস্টপূর্বাব্দ (BCE)। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম সভ্যতা।
যুগ: এটি Chalcolithic Age (চ্যালকোলিথিক যুগ) বা ব্রোঞ্জ যুগের (Bronze Age) সভ্যতা।
নামকরণ: 'Indus Valley Civilization' নামটি দিয়েছিলেন জন মার্শাল (John Marshall), যিনি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (ASI) ডিরেক্টর ছিলেন। এছাড়াও এটি হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত।
ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের জনক: আলেকজান্ডার কানিংহাম (Alexander Cunningham) ছিলেন ASI-এর প্রথম চেয়ারম্যান এবং তাঁকে ফাদার অফ ইন্ডিয়ান আর্কিওলজি (ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের জনক) বলা হয়।
সর্বাধিক প্রাচীন কেন্দ্র: হরিয়ানার ভীরান্না (Bhirrana) মেহেরগড়ের থেকেও প্রাচীনতম সভ্যতা হিসেবে পরিচিত।
আবিষ্কার: 1921 সালে দয়ারাম সাহানি প্রথম হরপ্পা নগরটি আবিষ্কার করেন। এরপর 1922 সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি (Geographical Extent)
- উত্তরে: মান্ডা, কাশ্মীর (Manda, Kashmir)
- দক্ষিণে: দাইমাবাদ, মহারাষ্ট্র (Daimabad, MH)
- পূর্বে: আলমগীরপুর, উত্তরপ্রদেশ (Alamgirpur, UP)
- পশ্চিমে: সুটকাগেন্ডোর, পাকিস্তান (Sutkagendor, Pak)
- আফগানিস্তানের কেন্দ্র: মুন্ডিগাক (Mundigak) ও শোরতুঘাই (Shortugai)।
বর্তমান পাকিস্তানের চোলিস্তান (Cholistan) অঞ্চল একসময় এই সভ্যতার একটি সমৃদ্ধ অংশ ছিল।
কৃষিকাজ ও পশুপালন (Agriculture & Domestication)
- প্রধান ফসল: গম (Wheat) এবং যব (Barley)। এছাড়া তুলো, মসুর ডাল, ছোলা, তিল, বাজরা এবং রসুনের চাষ হতো।
- ধান চাষ: ধান চাষের নিদর্শন খুব বিরল, তবে লোথাল (গুজরাট) ও রংপুর (গুজরাট)-এ ধানের তুষ পাওয়া গেছে।
- ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম কৃষিকার্যের প্রমাণ মেলে মেহেরগড়ে।
- সিন্ধুবাসীরাই প্রথম তুলোর (Cotton) ব্যবহার শুরু করে। গ্রিকরা তুলোকে 'সিন্ডন' বলত।
- কৃষি প্রযুক্তি: কালিবঙ্গানে (রাজস্থান) লাঙ্গল চষা জমির প্রমাণ মিলেছে, যেখানে দুটি আলাদা ফসল একসাথে চাষের প্রমাণ পাওয়া যায় (90° কোণে)। চোলিস্তান ও বনওয়ালীতে মাটির তৈরি লাঙ্গলের খেলনা পাওয়া গেছে। চাষের জন্য ষাঁড় ব্যবহার করা হতো।
- পশুপালন: ভেড়া, ছাগল, মহিষ, শূকর, ষাঁড় গৃহপালিত ছিল। এছাড়া শুয়োর, হরিণ, মাছ, পাখি ও ঘড়িয়ালের হাড়ের প্রমাণ মিলেছে।
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: ঘোড়া ও গরুর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে গুজরাটের সুরকোটোডা থেকে ঘোড়ার হাড় উদ্ধার হয়েছে। ইউনিকর্ন (Unicorn) ও উঁচু কুঁজযুক্ত ষাঁড়ের (Humped bull) শীলমোহর প্রচুর পাওয়া গিয়েছে। তারা সিংহের ব্যবহার জানত না।
নগর পরিকল্পনা (Town Planning & Architecture)
হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর উন্নত নগরকেন্দ্র। রাস্তাগুলি গ্রিড প্যাটার্নে (Grid Pattern) তৈরি ছিল এবং একে অপরকে 90° কোণে ছেদ করত।
- ঘরবাড়ি পোড়া ইটের তৈরি ছিল, যার অনুপাত ছিল 1:2:4। দরজায় কাঠের ব্যবহার হতো।
- প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব স্নানাগার ছিল। অনেক বাড়িতে ব্যক্তিগত কুয়ো ছিল।
- জলনিকাশী ব্যবস্থা: এটি ছিল হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম সেরা বৈশিষ্ট্য। কঠিন বর্জ্য আটকানোর জন্য নর্দমার মাঝে সাম্প বা সেসপিট (Sump or Cesspit) ছিল এবং নর্দমা ঢাকতে চুনাপাথরের স্ল্যাব ব্যবহৃত হতো।
- নগরগুলি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল:
1. Citadel (উঁচু শহর): ছোট কিন্তু উঁচু স্থানে অবস্থিত, প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এটি বিশেষ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হতো।
2. Lower Town (নিচু শহর): বড়ো কিন্তু নিচু স্থানে অবস্থিত, মূলত সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য। এটিও প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত ছিল। - ব্যতিক্রম: চানহুদারো হলো একমাত্র শহর যেখানে কোনো দুর্গ (Citadel) ছিল না। ধোলাভীরা শহরটি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। লোথালে দুর্গ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল না, বরং উঁচু মাটির তৈরি প্ল্যাটফর্মে নির্মিত ছিল।
- হরপ্পানরা তামা বর্তমানের রাজস্থান (বিশেষ করে ক্ষেত্রী খনি অঞ্চল) এবং সোনা সম্ভবত বর্তমান ভারতের কর্ণাটক থেকে পেত। লাপিস লাজুলি আফগানিস্তানের শোরতুঘাই থেকে পেত। হরপ্পাবাসীরা পুঁতি তৈরির জন্য যে 'কার্নেলিয়ান' পাথর ব্যবহার করত, তার বেশিরভাগই আসত বর্তমান গুজরাটের রতনপুর বা ভারুচ অঞ্চল থেকে। এই কাঁচামাল সংগ্রহ করে লোথাল এবং চানহুদারোর মতো কারুশিল্প কেন্দ্রে পুঁতি তৈরি করা হতো।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য (Important Structures)
- বৃহৎ স্নানাগার (Great Bath): মহেঞ্জোদারোতে অবস্থিত। এটি একটি আয়তক্ষেত্রাকার জলাশয় যা সম্ভবত ধর্মীয় স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি 12 মিটার লম্বা, 7 মিটার চওড়া এবং 2.4 মিটার গভীর। জলরোধক করার জন্য জিপসাম (Gypsum) মর্টারের ব্যবহার করা হয়েছিল।
- বৃহৎ শস্যাগার (Great Granary): মহেঞ্জোদারোর সবচেয়ে বড়ো ইমারত। এটি শস্য মজুত রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। হরপ্পাতে দুটি সারিতে মোট 12 টি (প্রতি সারিতে 6 টি) ইটের তৈরি শস্যাগার পাওয়া গেছে।
বাণিজ্য ও কারুশিল্প (Trade, Commerce & Crafts)
- মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ধাতু তামা। তারা সোনার ব্যবহার জানলেও লোহার ব্যবহার জানত না। সিন্ধু সভ্যতার মানুষ তামা ও টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ (কাঁসা জাতীয় সংকর ধাতু) তৈরি করত।
- বিনিময় প্রথা (Barter System) প্রচলিত ছিল। ওজন মাপার জন্য "Chert" নামক পাথর ব্যবহার করা হতো, যা সুক্কুর ও রোহরি পাহাড় (পাকিস্তান) থেকে আসত।
- ওজনের এককগুলি 16 এর গুণিতকে (Multiples of 16) মাপা হতো। ছোটো ওজনের জন্য বাইনারি (Binary) এবং বড়ো ওজনের জন্য ডেসিমাল (Decimal) পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো।
- শিল্পকেন্দ্র: চানহুদারো ছিল পুঁতি তৈরি, শীলমোহর, ওজনের পাথর তৈরি এবং ধাতুশিল্পের প্রধান কেন্দ্র। নাগেশ্বর (গুজরাট) এবং বালাকোট (পাকিস্তান) শাঁখের (Shell) গহনা তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল।
- মেসোপটেমিয়া (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে) সভ্যতার সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। সুমেরীয়রা সিন্ধু সভ্যতার লোকেদের 'মেলুহা' (Meluha) বলত। হরপ্পাবাসীরা জাহাজ তৈরির কৌশল জানত।
- মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলায় অবস্থিত দাইমাবাদ (Daimabad) নামক প্রত্নস্থল থেকে হরপ্পা যুগের একটি রথের ব্রোঞ্জের প্রতিকৃতি পাওয়া গেছে।
লিপি ও ধর্মীয় বিশ্বাস (Scripts & Religious Practises)
- লিপি: এদের লিপি ছিল পিকটোগ্রাফিক (Pictographic), যা আজ পর্যন্ত পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এরা প্রথম লাইন ডান থেকে বামে এবং পরের লাইন বাম থেকে ডানে লিখত, এই পদ্ধতিকে Boustrophedon (বাউস্ট্রেফেডন) বলা হয়। সবচেয়ে বড়ো লিপিতে 26 টি চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের খরোষ্ঠী লিপি (Kharosthi script) ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হতো।
- শীলমোহর: বেশিরভাগ শীলমোহর নরম পাথর স্টিয়াটাইট (Steatite) দিয়ে তৈরি। এতে প্রাণীদের ছবি এবং ছোটো লিপি থাকত।
- ধর্মবিশ্বাস: তারা মাতৃদেবীর (Mother Goddess - মাটির মূর্তি) পূজা করত, যা মাটি থেকে গাছের জন্মের প্রতীক। এছাড়া লিঙ্গ বা শিবের উপাসনা এবং পশুপতি মহাদেবের (যোগাসনে বসা শিব) পূজার প্রমাণ মেলে। স্বস্তিকা (Swastika) চিহ্নের ব্যবহার ছিল।
- মূর্তি: মহেঞ্জোদারো থেকে স্টিয়াটাইটের তৈরি 17.5 সেমি (6.9 ইঞ্চি) উচ্চতার 'দাড়িওলা সাধকের' মূর্তি (Priest King) এবং ব্রোঞ্জের তৈরি 10.5 সেমি উচ্চতার 'নৃত্যরত মহিলার' (Dancing Girl - ত্রিভঙ্গ মুদ্রায়) মূর্তি পাওয়া গেছে।
মৃতদেহ সৎকার (Studying Burials)
মৃতদেহ সৎকারের সময় কবরের সাথে মৃৎশিল্প, গহনা এবং তামার আয়না দেওয়া হতো, কারণ তারা পরকালে বিশ্বাস করত।
- কুকুরকে তার প্রভুর সাথে কবর দেওয়ার প্রমাণ মেলে। (রোপার, পাঞ্জাব)
- লোথাল: এখানে যুগল সমাধির (Double Burial) প্রমাণ পাওয়া গেছে।
- সানাউলি (UP): Extended Burial পাওয়া গেছে।
- হরপ্পাতে R-37 এবং H আকৃতির কবরস্থান পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় urn burial (কলসিতে দেহভস্ম) প্রথাও ছিল।
সভ্যতা পতনের কারণ (Reasons for Decline)
পতনের সঠিক কারণ জানা না গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change), বৃক্ষচ্ছেদন, ভয়াবহ বন্যা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা শুকিয়ে যাওয়া এবং বিদেশি আক্রমণকে (Foreign invasion) প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়।
সিন্ধু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রসমূহ (Important Sites at a Glance)
| শহরের নাম (আবিষ্কারক ও সাল) | অবস্থান ও নদী | উল্লেখযোগ্য নিদর্শন / বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| মহেঞ্জোদারো (Mohenjodaro) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, 1922 |
সিন্ধু নদী (সিন্ধু প্রদেশ, পাকিস্তান) | সবথেকে বড়ো শহর। অর্থ: মৃতের স্তূপ (সিন্ধি ভাষায়)। বৃহৎ শস্যাগার, বৃহৎ স্নানাগার, দাড়িওলা সাধক, ব্রোঞ্জের নৃত্যরত মহিলা, পশুপতি শীল। |
| হরপ্পা (Harappa) দয়ারাম সাহানি, 1921 |
রাভি নদী (পাঞ্জাব প্রদেশ, পাকিস্তান) | দুটি সারিতে 6 টি করে 12 টি শস্যাগার, R-37 ও H আকৃতির কবরস্থান, কাঠের বাক্সে গম ও বার্লি। |
| চানহুদারো (Chanhudaro) এন. জি. মজুমদার |
সিন্ধু নদী (পাকিস্তান) | একমাত্র দুর্গ বিহীন নগর (City without Citadel)। কারুশিল্পের কেন্দ্র। |
| লোথাল (Lothal) এস. আর. রাও |
ভোগোভা নদী (গুজরাট, ভারত) | বন্দর শহর (Dockyard), ধান চাষের নিদর্শন, যুগল সমাধি (Double Burial), ফায়ার অল্টার (Fire altar)। |
| কালিবঙ্গান (Kalibangan) | ঘর্ঘরা নদী (রাজস্থান, ভারত) | কৃষিজমির নিদর্শন (Ploughed Fields), উটের হাড়, 7 টি ফায়ার অল্টার, কালো চুড়ি। |
| রাখীগারহী (Rakhigarhi) | ঘর্ঘরা নদী (হরিয়ানা, ভারত) | ভারতে অবস্থিত সিন্ধু সভ্যতার সবথেকে বড়ো শহর। মাটির চাকা, খেলনা। |
| ধোলাভীরা (Dholavira) জে. পি. যোশী |
কচ্ছ অঞ্চল (গুজরাট, ভারত) | বৃহৎ জলাধার, অদ্বিতীয় জলনিকাশী ব্যবস্থা, শহরটি তিন ভাগে বিভক্ত। 2021 সালে ভারতের 40-তম UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পেয়েছে। |
| বনওয়ালী (Banawali) আর. এস. বিষ্ট |
হরিয়ানা (ভারত) | বার্লির নিদর্শন, উন্নত গ্রিড প্যাটার্নের অভাব। |
| সুরকোটোডা (Surkotada) | গুজরাট (ভারত) | ঘোড়ার হাড় পাওয়া গিয়েছে। |

Social Plugin